Home গল্প জীবন যেখানে যেমন

জীবন যেখানে যেমন

0
65

জীবন যেখানে যেমন

জীবন যেখানে যেমন

# পর্ব-১

যেদিন ক্লাসের সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েটা সবার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলো,আমি নাকি তাঁর বুকে হাত দিয়েছিলাম,তাকে নষ্ট করতে চেয়েছিলাম। সেদিন সবাই আমার দিকে অনেক ঘৃণা নিয়ে তাকিয়ে ছিলো। ক্লাসের প্রায় আশি জন ছাত্র-ছাত্রী সবাই আমাকে খারাপ ভেবেছিলো। সবাই মেয়েটার কান্না ভেজা কণ্ঠটা বিশ্বাস করেছিলো। আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধুটাও সেদিন আমার থেকে দূরে সরে গিয়েছিলো। আমার সবচেয়ে প্রিয় শিক্ষকটা আমার গালে চড় মেরে বলেছিলো,
“তুমি অনেক ভালো ছাত্র। আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসতাম। কিন্তু তুমি আজকে যেই কাজটা করেছো তার জন্য আমার ভালোবাসাটা তোমার জন্য চিরতরে শেষ হয়ে গিয়েছে। নিজেকে একজন ভালো মানুষ হিসেবে যে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে না সে যতোই ভালো ছাত্র হোক,টাকার মালিক হোক এসবে কিছু যায় আসে না। একজন মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো সে একজন মানুষ। তবে তোমার মতো মানুষ না। তুমি এখনো মানুষ হতে পারোনি। যদি পারো মানুষ হয়ে দেখাও।”
 
সেদিন আমি ক্লাসের কারো দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারেনি। কোনো অপরাধ না করেও নিজেকে অনেক বড় অপরাধী মনে হয়েছিলো। আমার দুঃখটা সেদিন কারো সাথে শেয়ার করতে পারিনি। ক্লাসে যতটুকু সময় ছিলাম ততোটুকু সময় আমি নিচের দিকে তাকিয়ে শুধু চোখের পানি ফেলেছিলাম। সেদিন আমি বুঝেছিলাম চোখের পানিরও দাম কম আর বেশি হয়। কারণ মেয়েটার চোখের পানি দেখে সবাই অনেক ইমোশনাল হয়ে গিয়েছিলো,আমি মেয়েটার সাথে এসব করেছি কিনা সেটা না জেনেই সবাই মেয়েটার জলভরা চোখ দেখে তাঁর কথা বিশ্বাস করেছিলো। কিন্তু আমার চোখের পানিটা কাউকে আবেগী করতে পারেনি। আমার মতোই আমার চোখের পানিটাও কম দামী।
ক্লাস থেকে চলে আসার সময় ওই মেয়েটার সাথেই আমি কথা বলি। যে মেয়েটা সবার সামনে আমাকে এভাবে খারাপ একটা ছেলে হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। আমি তাঁর কাছে গিয়ে তাকে কিছু কথা বলি।
 
” তুমি এমনটা না করলেও পারতে। তুমি হয়তো ভেবেছিলে এমনটা করার পর আমি তোমার সম্পর্কে কোনো কিছু বললে কেউ বিশ্বাস করবে না। সবাই ভাববে তোমার ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তোমার সম্পর্কে খারাপ কথা বলছি। কিন্তু তুমি হয়তো জানো না তুমি এসব না করলেও আমি তোমার সম্পর্কে কারো কাছে কিছু বলতাম না। তবে ভয় পেয়ো না এখনও তোমার সম্পর্কে কারো কাছে কিছু বলবো না। যে মানুষটা আমাকে সবার সামনে খারাপ বানিয়েছে,আমি তাকে সবার সামনে খারাপ বানাতে চাই না।”
কলেজ থেকে বাসায় যাওয়ার পথে যখন দেখলাম সবাই আমার দিকে কেমন করে যেনো তাকিয়ে আছে। তখন আমার বুঝতে অসুবিধা হলো না,আমার খবরটা এলাকার অনেকেই জেনে গিয়েছে। তাই তারা আমার দিকে এভাবে তাকিয়ে আছে। এসব খবর বাতাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে যায়। আমারটাও হয়তো সেভাবেই সবার কাছে পৌছে গিয়েছে। হয়তো বা বাড়িতেও জেনে গিয়েছে। এমনিতেই মা আমার দোষ খোঁজেন সবসময়। একটু ভুল পেলেই বাড়ি থেকে বের করে দিতে চান। শুধু বাবা বলে কয়ে হয়তো আমাকে বাড়ির এককোণে ছোট্ট একটা রুম দিয়ে রেখে দিয়েছেন। মা চায় না আমি এই বাড়িতে থাকি।
যখন বাসায় গেলাম তখন দেখলাম মা আর বাবা দরজার বাহিরে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের দেখে বুঝতে পারলাম কলেজের ঘটনাটা তারা জেনে গিয়েছে। তখন আর দেরি না করে আমি বাবাকে বললাম,
“আমি কিছু করিনি বাবা,বিশ্বাস করেন। আমার মৃত মায়ের কসম বাবা আমি কিছু করিনি।”
“তুই যদি কিছু নাই করবি তাহলে মেয়েটা তোর সম্পর্কে এসব বলবে কেনো? তোর ক্লাসে তো আরও অনেক সুন্দর সুন্দর ছেলে আছে তাদের সম্পর্কে তো এরকম বলল না, তোর সম্পর্কে কেনো বলল? তুই এসব করেছিস বলেই সে সবার সামনে এসব বলেছে। একটা মেয়ে কখনো নিজের মানসম্মান নিয়ে এরকম মিথ্যা বলবে না। মিথ্যা তো তুই বলছিস এখন আমাদের সাথে।”
আমার সৎ মা যখন কথাগুলো বলল তখন আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলাম। কি বলবো কিছু বুঝতে পারছিলাম না। তবে এটা বুঝতে পেরেছিলাম যাই বলি না কেনো আমার কথা কেউ এখন বিশ্বাস করবে না।
 
হঠাৎ করেই মা বাবাকে যে কথাগুলো বলল সেই কথাগুলো শোনার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না।
“তুমি তোমার ছেলেকে বাড়িতে রাখলে আমি থাকবো না এই বাড়িতে। আমি কোনো ধর্ষককে এই বাড়িতে রাখতে চাই না। আমার একটা মেয়ে আছে, আমি আছি। আমরা তো ওর আপন কেউ না। আমি তো আর ওর আপন মা না,হাবিবাও তো আর ওর আপন বোন না। সুযোগ পেলে কি না কি করে বসবে কে জানে। তুমি ওকে বাড়ি থেকে বের করে দাও।”
মা যখন বাবাকে কথাগুলো বলল তখন আমার চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়ছে। আমি ভাবতাম সৎ মা হলেও একদিন আমাকে ঠিকই নিজের মায়ের মতো আদর করবে। আমি সবসময় আমার সৎ মায়ের মন জয় করার চেষ্টা করেছি কিন্তু আমি ব্যর্থ হয়েছি। তবে কোনোদিন ভাবিনি আমার সম্পর্কে এতোটা খারাপ ধারণা জন্ম নিবে তাঁর মনে। নিজেকে পৃৃথিবীর সবচাইতে অপবিত্র মানুষ মনে হচ্ছে। লজ্জায়,অপমানে সেদিন আমি তাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে পারিনি। এই বাড়ি ছাড়া কোথায় যাবো আমি সেটা না জানা সত্ত্বেও আমি সেখান থেকে কাঁদতে কাঁদতে চলে আসি। আমার বাবা একটিবারের জন্যও আমাকে থাকতে বলেনি। সেদিন আমি খুব করে বুঝেছিলাম আমাদের বাবা ছেলের সম্পর্কটা হয়তো শেষ হতে চলেছে। এটাও বুঝতে পেরেছিলাম এই বাড়িতে হয়তো আর কোনোদিন আমার জায়গা হবে না। আমাকে চলে যেতে হবে অজানা অচেনা কোনো এক নতুন ঠিকানায়।
আমার কাছের মানুষগুলো আমাকে বুঝতে পারেনি। ভুল বুঝে দূরে ঠেলে দিয়েছে। এখন একজন মানুষই আছে যে মানুষটা আমার শেষ ভরসা। যে মানুষটাকে আমি অনেক বিশ্বাস করি,অনেক ভালোবাসি। সে মানুষটাও আমাকে অনেক বিশ্বাস করে,ভালোবাসে। তবে কেনো জানি ভয় হচ্ছে। আর সবার মতোই কি সেও আমাকে খারাপ ভাববে,আমাকে বিশ্বাস করবে না? অনেক প্রশ্নের উত্তর থেকেই যাচ্ছে। তাঁর সাথে দেখা না হওয়া পর্যন্ত এসব প্রশ্নের উত্তর আমি পাবো না জানি। তবুও কেনো জানি প্রশ্নগুলো নিয়ে ভাবতে ইচ্ছে করছে।
সেদিন রাতটা আমি সিয়াম নামের এক বন্ধুর বাসায় তাঁর সাথেই থাকি। ও হয়তো বিশ্বাস করেছিলো আমি এসব করিনি। আমি এতোটা খারাপ মানুষ না যে একটা সুন্দরী মেয়ের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাঁর বুকে হাত দিবো,কিংবা কে জানে? হয়তো বা বিশ্বাসও করেছিলো। ভদ্রতার খাতিরে বলতে পারেনি। কারণ কিছু কিছু কথা থাকে যেগুলো অনেক সময় মানসম্মান কিংবা ভদ্রতার খাতিরে বলা যায় না। বিপরীত পাশের মানুষটার অবস্থার কথা চিন্তা করে অনেক মানুষই বলতে পারে না। আবার কিছু মানুষ থাকে যারা বিপরীত পাশের মানুষটা কথা চিন্তা করে না,একবারও ভাবে না কথাগুলো বললে তাঁর অবস্থাটা কি হবে।
 
সেদিন সিয়ামের ওখান থেকেই আমি আদিবার সাথে ফোনে কথা বলি। তাকে বিকেল তিনটার সময় আমার সাথে দেখা করতে বলি। সেও ঠিক সময়ে ঠিক জায়গায় চলে আসবে বলে ফোনটা রেখে দেয়। আমিও ঘুমানোর বৃথা চেষ্টা করে বিছানায় গা এলিয়ে দেই। তবে সেদিন রাতটা আমার নির্ঘুম কাঁটে।
সেদিন ছিলো শুক্রবার। সিয়ামের সাথেই জুমার নামাজটা পড়ে ওর বাসায় দুপুরে খেয়ে ওর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসি।
“আমি তোর প্রতি অনেক কৃতজ্ঞ। একটা রাত আমাকে থাকতে দিয়ে অনেক উপকার করলি।” এই কথাগুলো বলে আমি সিয়ামের ওখান থেকে আদিবার সাথে দেখা করার জন্য চলে যাই।
আদিবার সাথে দেখা করতে গিয়ে যা দেখলাম সেটা নিজের চোখকে বিশ্বাস করাতে পারলাম না। কারণ আদিবা আজ একা আসেনি,তাঁর সাথে সে একটা মেয়েকে নিয়ে এসেছে। তাঁর সাথে যে মেয়েটা এখন দাঁড়িয়ে আছে সেই মেয়েটাই ক্লাসে সবার সামনে আমাকে অপমান করেছিলো,খারাপ বানিয়েছিলো। আমি বুঝতে পারলাম না আদিবার সাথে মেয়েটার কি সম্পর্ক। আদিবার কোনো কাজিন নাকি বান্ধবী?

জীবন যেখানে যেমন

# পর্ব-২

 
“আমি নাদিয়ার কাছ থেকে সব শুনেছি। সে আমার চাচাতো বোন। তাঁর চেয়ে বড় কথা সে আমার খুব কাছের বান্ধবী। আমি আমার জীবনের সবকিছুই তার সাথে শেয়ার করেছি। এমন কি খুব গোপনীয় যেটা একমাত্র নিজের মনের মধ্যেই মানুষ সীমাবদ্ধ রাখে। সেই গোপনীয় কথাগুলোও আমি তাকে বলেছি। আমার খুব খারাপ লেগেছে যখন শুনলাম তুমি নাদিয়ার সাথে এরকম কিছু করার চেষ্টা করেছো। নিজের প্রতি অনেক ঘৃণাও হয়েছে,আমি তোমার মতো লম্পট একজন মানুষকে ভালোবেসে বাকিটা জীবন কাঁটাতে চেয়েছিলাম।

কিন্তু নাদিয়া আমার চোখ খুলে দিয়েছে। আমি তোমাকে কথাগুলো ফোনেও বলতে পারতাম কিন্তু আমি তোমার এই অসভ্য,লুচ্চা মার্কা চেহারাটা দেখতে চেয়েছিলাম। সবসময় তুমি তোমার সভ্য চেহারাটা দেখিয়ে এসেছো। কিন্তু তোমার সভ্য চেহারার মাঝেও যে একজন খারাপ মানুষ বাস করে সেই মানুষটাকেই আমি দেখার জন্য এসেছি। আমি দেখতে চেয়েছিলাম তোমার ভিতরের খারাপ মানুষটাকে কতোটা জঘন্য লাগে। আমি দেখেছি। আমার সাথে কোনো যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করো না। আমি তোমাকে ভুলে যাবো তুমিও আমাকে ভুলে যেও।”

আদিবা যখন কথাগুলো বলল তখন আমি বুঝতে পারলাম আমার শেষ ভরসার মানুষটাও আমাকে বিশ্বাস করেনি,ভুল বুঝে দূরে ঠেলে দিতে চাইছে। আমার কিছু বলতে ইচ্ছে করছিলো না। মানুষকে কখনো জোর করে নিজের কাছে ধরে রাখা যায় না। রাখলেও সেটা বেশিদিন স্থায়ী হয় না। আমিই ভুল করে এতোদিন মরীচিকার পেছনে ছুটে এসেছি। যে শুধু সুযোগের অপেক্ষায় ছিলো। আজ সুযোগ পেয়েছে সেটাই কাজে লাগাচ্ছে। এখানেও আমাকেই দোষী মনে হচ্ছে। কারণ একজন খারাপ মানুষের সাথে হয়তো কেউ জেনে শুনে জীবন পাড় করবে না।

“বেশি কিছু বলবো না,ভালো থেকো। আর তোমার চাচাতো বোনকেও ভালো থাকতে বইলো। তবে আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করতাম পৃৃথিবীর আর সবাই আমাকে ভুল বুঝলেও তুমি আমাকে ঠিকই বুঝবে,পৃৃথিবীর আর সবাই আমাকে খারাপ ভাবলেও অন্তত তুমি আমাকে খারাপ ভাববে না। কিন্তু যখন তুমি বললে আমি খারাপ মানুষ,আমার সাথে সম্পর্ক রাখবে না। তখন নিজেকেই খারাপ মনে হচ্ছে। কেনো জানি মনে হচ্ছে,আজও বিশুদ্ধ হতে পারিনি,তবে হওয়ার অপেক্ষায় থাকবো। আবারও বলছি তোমার চাচাতো বোনকে অনেক অনেক ভালো থাকতে বইলো। দোয়া করি তোমাদের দুজনের কারো জীবনেই যেনো আমার মতো খারাপ মানুষের আগমন না ঘটে।”

কথাগুলো যখন বললাম আদিবা তখনও চুপ করে ছিলো। তাঁর নীরবতা জানান দিয়ে যাচ্ছিলো সে আমার সাথে আর কথা বলতে চাচ্ছে না। অথচ আমি ভেবেছিলাম আদিবা প্রতি উত্তরে কিছু বলবে। কিন্ত আমার কান্না ভেজা কণ্ঠাটাও তাঁর নীরবতা ভাঙতে পারেনি।
তারা দুজন চলে যাচ্ছে। আমি নাদিয়া মেয়েটার দিকে তাকিয়ে আছি আর ভাবছি। একজন মানুষ কতো সুন্দর করে প্লান সাজিয়ে অন্য একজন মানুষের জীবনকে নরকে পরিণত করতে পারে সেটা এই মেয়েটাকে দেখলে বোঝা যায় না। কে ভাববে এই সুন্দর নিষ্পাপ মেয়েটা একটা ছেলের সুন্দর গোছালো জীবনটাকে তসনস করে দিয়েছে। শুধু মেয়েটা সম্পর্কে ছেলেটার মনে একটা খারাপ ধারণা জন্ম নিয়েছিলো বলে। মেয়েটা ভয় পেয়েছিলো যদি ছেলেটা সবার কাছে তাঁর কথা বলে দেয় তাহলে তো সে কারো সামনে নিজের মুখ দেখাতে পারবে না। সেজন্যই হয়তো ছেলেটাকে সবার সামনে এমনভাবে উপস্থাপন করলো যে এখন ছেলেটাকে পৃৃথিবীর একটা মানুষও বিশ্বাস করে না। মেয়েটাও নিশ্চিত হয়ে গেছে তাঁর কথাটা এখন যদি মাইক মেরেও বলে দেয় তাহলে কেউ বিশ্বাস করবে না। সবাই পাগল ভাববে ছেলেটাকে।

আমার মনে হলো আমি বাদে আমার আপন বলতে কেউ নেই। ঢাকা শহরে এতো এতো মানুষ থাকলেও আমার জন্য কেউ নেই। তাই ঢাকা শহরে থাকার কোনো প্রয়োজন মনে করলাম না। আর থেকেই বা কি করবো? কোথায় থাকবো? কে খাবার দিবে? এসব ভাবতেই চোখে জল এসে পড়ে। এতোটা অসহায় কখনো ছিলাম না আমি। জীবনে কখনো ভাবিওনি এতোটা অসহায়ত্ব এর স্বীকার হতে হবে আমাকে। কিন্তু আজ হয়েছি। এটাই হয়তো ভাগ্যে ছিলো আমার।
যাওয়ার কোনো জায়গা খুঁজে না পেয়ে নানার বাড়ি চলে যাই। যদিও আমার মামারা বারো বছর আগেই আমাদের সাথে সব সম্পর্ক শেষ করে দিয়েছে। মা মারা যাওয়ার পর কোনোদিন মামাদের সাথে কোনো কথা হয়নি। তারাও কখনো কোনো খোঁজ নেয়নি। তাদের একটা ভাগনে আছে এটা হয়তো তারা ভুলেই গিয়েছে। তবে আমার নানার আর্থিক অবস্থা আগে থেকেই অনেক ভালো ছিলো। তাই আমি জানতাম তারা যখন জানবে আমি তাদেরই ভাগনে তখন হয়তো তারা আমাকে ফেলে দিবে না।
আমাকে দেখে নানা নানী অনেক খুশি হলেও মামারা আমাকে দেখে কেনো জানি খুশি হতে পারেনি। হয়তো বা তাদের ভালোবাসাটা তাদের বোনের জন্য ছিলো। বোন মারা যাওয়ার সাথে সাথে আমার প্রতি তাদের ভালোবাসাটাও মরে গিয়েছে। তবে আমি এটা নিয়ে দুঃখ করলাম না। কারণ যেখানে ভালোভাবে বেঁচে থাকাটাই একটা যুদ্ব সেখানে কারো মনের খবর নেওয়াটা বিলাসিতা ছাড়া আর কিছু না।

দুইটা বছর আমি মামাদের বাসায় ছিলাম। এই দুই বছরে আমাকে অনেক কিছুই করতে হয়েছে,অনেক অপমান সহ্য করতে হয়েছে। তবে এই দুই বছরে আমি অনেক কিছু শিখেছি,জীবনের মানে জেনেছি। জীবনটা এতো সহজ না,জীবনটা জটিল একটা সমস্যা। এই সমস্যাটা সমাধান করেই আমাদেরকে প্রতিনিয়ত বেঁচে থাকতে হয়। আমিও বেঁচে ছিলাম।
আমার চারটা মামা ছিলো। তাদের সবারই ছেলে মেয়ে ছিলো। আমি সবাইকেই রাতে পড়াতাম। নিজের ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও পড়াতাম। কারণ এরাই যে আমাকে দুবেলা দুমুঠো খাবার দিয়ে আশ্রয় দিয়েছে। প্রতিদিনই আমি বাজার করে দিতাম। মামারা কখনো আমাকে কোনো কাজ করতে বলতো না। যা বলার মামীরাই বলতো। আমিও তাদেরকে কোনো সময় না করতে পারতাম না। ভয় হতো যদি আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। তাই কষ্ট হলেও সবার সবরকম কাজ করে দিতাম আমি। তবুও মামীরা আমার ওপর কোনো কারণে বিরক্ত থাকতো আমি বুঝতে পারতাম। তবে বিরক্ত হওয়ার কারণটা খুঁজে পেতাম না। আমার নানা-নানী আমাকে অনেক ভালোবাসতো। তাদের ভালোবাসাটাই হয়তো এতো কিছুর মাঝেও একটু সুখে খুঁজে নিতে সাহায্য করতো।
মামাদের বাসায় থেকেই আমি এইচএসসি পাশ করি। অনেক ভালো রেজাল্টও করি। তবে আমার রেজাল্টে খুশি হওয়ার মতো কোনো মানুষ ছিলো না। আমি নিজেই নিজের প্রতি সেদিন অনেক খুশি হয়েছিলাম। তারপরে অনেক জায়গায় পরীক্ষা দেই। ভাগ্যক্রমে ঢাকার একটা পাবলিক ভার্সিটিতে চান্স পেয়ে যাই।
মামাদের বাসা থেকে আমি আবার আমার পুরাতন শহর ঢাকায় ফিরে আসি। দুই বছর আগে এই শহরটাকেই আমি বিদায় জানিয়ে চলে গিয়েছিলাম। আজ দুই বছর পর আবার এই ঢাকাতেই ফিরে এসেছি।

আমার আর্থিক অবস্থার কথা কয়েকটা বড় ভাইকে বলেছিলাম। সেই সুত্রেই এক বড় ভাই একটা বড় ধরণের টিউশনি যোগাড় করে দেয় আমাকে। যেটা দিয়ে আপাতত আমার কষ্ট হলেও মাস চলে যাবে। পরে না হয় কিছু একটা করা যাবে। এই ভেবেই ঢাকায় চলে আসি। আসার আগে নানা আমার হাতে কিছু টাকা দিয়ে দিয়েছিলো যেটা আমার ভার্সিটিতে ভর্তির সময় অনেক কাজে লাগে। আর কিছু টাকা ভবিষ্যতের কথা ভেবে যত্ন করে নিজের কাছে রেখে দেই।
আজ আমার টিউশনির প্রথম দিন। তাই একটু পরিপাটি হয়ে যাচ্ছি। কারণ বড় ভাই বলেছে তারা খুব বড়লোক। সেজন্যই এতো টাকা বেতন দিয়ে একজন টিউশন শিক্ষক রাখবে।
বড় ভাই যখন আমাকে ছাত্রের বাসায় নিয়ে গেলেন পরিচয় করিয়ে দিবেন বলে। তখন দরজায় কলিংবেল চাপতেই একটা সুন্দরী মেয়ে দরজা খুলে দিলো। আমি মেয়েটার দিকে জাস্ট থ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। কারণ এই মেয়েটাই আমার জীবনের অভিশাপ। এই মেয়েটার কারণেই আমার জীবনে দুই বছর আগে প্রচন্ড ঝড় নেমে এসেছিলো। সেই ঝড়ে আমি নিঃস্ব হয়ে গিয়েছিলাম। আজও আমি নিঃস্ব।

জীবন যেখানে যেমন

# র্ব-৫

নিজের প্রতি খুব বেশি ঘৃণা হচ্ছে। নিজেকে অনেক খারাপ মানুষ মনে হচ্ছে। যে মানুষটাকে আমি সবসময় ঘৃণা করে এসেছি,যে মানুষটা আমার অতীতের জীবনটাকে নরকে পরিণত করে দিয়েছে,যে মানুষটার কারণে আমার বাবা আমার থেকে চিরদিনের জন্য দূরে চলে গিয়েছে। যে মানুষটার কারণে আমার সৎ মা আমাকে ধর্ষক ভেবে বাসা থেকে বের করে দিয়েছে,যে মানুষটা আমাকে আমার বোনের আদর ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করেছে। সেই মানুষটার সাথেই আজ আমি শারীরিক সম্পর্ক করলাম। আমিও অন্য সবার মতো লোভী মানুষ। না হলে কি নাদিয়ার নগ্ন শরীরটা দেখে তাঁর সাথে এই কাজটা করতে পারতাম? অন্য সবার মতো আমিও নাদিয়ার এতো সুন্দর দেহটার লোভ সামলাতে পারিনি। তাঁর সাথে নিজের জীবনের সবচেয়ে জঘন্য কাজটা করেছি আমি।
 
অথচ যেদিন মেয়েটা আমাকে ভালোবেসে শহরের বিলাসী ফুল দিয়ে বলেছিলো,
“আমিনুল,তুমি আমার বাগান বিলাস হবে? আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি। যেদিন থেকে তোমাকে দেখেছি সেদিন থেকেই আমি আমার মনের রাজত্বটা তোমাকে দিয়ে দিয়েছি। আমি না চাইতেও সবসময় তোমাকে মনে করি,তোমাকে নিয়ে আমার অবচেতন মন কল্পনার সপ্তম মহাকাশে প্রতিনিয়ত ঘুরে বেরায়। তুমি হয়তো জানো না কল্পনায় আমি তোমার সাথে কিসব করি। যদি জানতে তাহলে কি লজ্জাটায় না পেতাম আমি। তুমি কি তোমার বুকে আমাকে একটু জায়গা দিবে না?”
তখন আমি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলেছিলাম,
 
“দেখো আমি তোমার ভালোবাসাকে অনেক রেসপেক্ট করি। কিন্তু আমি তোমাকে কখনো ভালোবাসতে পারবো না। কারণ আমি অন্য একজন মানুষকে ভালোবাসি।”
“আমি আমার জীবনে আজ পর্যন্ত যা চেয়েছি তাই পেয়েছি। তুমি হয়তো আমার সম্পর্কে জানো না। আমি নিজের প্রয়োজনে কতোটা খারাপ হতে পারি তুমি কল্পনাও করতে পারবে না।”
” আমি জানতে চাইও না। তোমার সম্পর্কে জানার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা আমার নেই।”
” তুমি যদি চাও আমার ভালোবাসার প্রমাণ দেওয়ার জন্য আমি তোমার সাথে বিছানায় রাত কাটাবো। তোমাকে নিজের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদটা দিয়ে দিবো। বিনিময়ে তোমাকে আমার চাই।”
” তুমি দেখতে যতোটা সুন্দর তোমার ভিতরটা ততোটাই নোংরা।”
” আমি তো আগেই বলেছি আমি নিজের প্রয়োজনে পৃৃথিবীর সবচাইতে জঘন্য কাজটা করতেও পিছ পা হবো না। সেখানে আমার ভালোবাসার মানুষকে নিজের করে পাওয়ার জন্য আমি সবকিছুই করতে পারি।”
 
সেদিন আমার কি হয়েছিলো আমি জানি না,আমি এর আগে কখনো এতো খারাপ ব্যবহার কারো সাথে করিনি। এতো খারাপ কথাও কাউকে বলিনি। খুব গর্ব করে সেদিন নাদিয়াকে বলেছিলাম,
“তুমি দেখতে অনেক সুন্দর হতে পারো কিন্তু তোমার মতো হাজারটা মেয়ে যদি উলঙ্গ হয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে তবুও আমি চেয়ে দেখবো না। তুমি যতোটা না সুন্দরী তাঁর থেকে অনেক বেশি অহংকারী। তোমার মতো এতো খারাপ মেয়ে আমি আমার জীবনে দেখিনি। একটা ভালো মেয়ে কখনো কোনো ছেলেকে সরাসরি সেক্স করার জন্য বলবে না। আমি যদি তোমার এসব কথা সবাইকে বলি তাহলে একবার ভাবো,তোমার অবস্থাটা কি হবে? কারো সামনে মাথা উঁচু করে চলতে পারবে না তুমি। তোমাকে খারাপ ভেবে তোমার সাথে অনেকেই রাত কাঁটাতে চাইবে। সেই সময়টা একটু কল্পনা করে দেখো,বুঝতে পারবে তুমি কেমন। নিজেকে এতোটা সস্তা ভাবো তুমি। আমার তো মনে হয় আসলেই তুমি সস্তা একটা মেয়ে”
কথাগুলো যখন নাদিয়াকে আমি বললাম তখন মনে হলো এসব আমি কি বললাম? এসব বলাটা আমার একদম উচিত হয়নি। আমি রাগ না করে তো মেয়েটাকে আরও ভালো ভাবে বুঝাতে পারতাম। বুঝাতে পারতাম এই পৃথিবীতে কিছু কিছু জিনিস থাকে যেগুলো কখনো জোর করে পাওয়া যায় না। তার মধ্যে ভালোবাসাও পড়ে। মনের ওপর কখনো জোর চলে না। মন যাকে চায় না তাকে ভালোবাসা যায় না। কিন্তু আমি তা না করে কতো কি বলে দিলাম মেয়েটাকে। আমি মেয়েটার দিকে তাকাতেই দেখলাম সে রাগে গদগদ করে ফুলছে আর কাঁদছে।
সেদিন নাদিয়া রাগে কাঁদতে কাঁদতে সেখান থেকে চলে গিয়েছিলো। আমি বিষয়টা দূর্ঘটনা মনে করে ভুলে গিয়েছিলাম। কিন্তু তার কিছুদিন পরেই যখন নাদিয়া ক্লাসে সবার সামনে আমাকে নিয়ে বাজে কথা বলল। নিজের সম্মানের কথা একবারও ভাবলো না। সেদিন আমি বুঝতে পেরেছিলাম নিজের স্বার্থের জন্য মেয়েটা সবকিছুই করতে পারে।
আজ সেই মেয়েটার সাথেই আমি শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়েছি,যে মেয়েটাকে একদিন আমি খুব গর্ব করে বলেছিলাম সে আমার সামনে নগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও আমি তাঁর দিকে তাকাবো না। অথচ আমার অতীতের গর্ব করাটা কতোই না বোকামি ছিলো সেটা আজ বুঝতে পারছি। আমি নাদিয়ার ওখান থেকে চলে আসি। আসার সময় নাদিয়া আমাকে কিছু বলেনি। তবে আমি বুঝতে পেরেছিলাম সে এটাই চেয়েছিল। তাই হয়তো প্ল্যান করে আমাকে পড়াতে আসতে বলেছিলো। আর আমিও বোকার মতো চলে এসেছিলাম।
 
নাদিয়া যদি এখন আমাকে আঙুল তুলে বলে,
“তোমার মতো ছেলেদেরকে খুব ভালো করেই চিনি আমি। পৃৃথিবীর সব ছেলেই এক। সুযোগ পেলে ছাড়ে না। তুমি তো বলেছিলো আমি নগ্ন হয়ে তোমার সামনে আসলেও তুমি আমাকে পাশ কাটিয়ে চলে যাবে। কিন্তু আজ কোথায় গেলো তোমার সেই নীতি কথা। আজ তো আমার কাপড়ে ঢাকা দেহটার লোভই সামলাতে পারলে না। নগ্ন দেহের কথা বাদই দিলাম।”
তখন আমি কি বলতাম? কিন্তু নাদিয়া আমাকে এসব কোনো কিছুই বলেনি। আমিও কোনো কিছু না বলে বাসায় এসে নিজেকে পবিত্র করার বৃথা চেষ্টায় এক ঘন্টার মতো গোসল করি। অথচ আমি জানি আর কখনো আমি বিশুদ্ধ হতে পারবো না। এই সাবান,সোডা দিয়ে নিজের নোংরা দেহটাকে পরিষ্কার করার কারণে আমার দেহটা বিশুদ্ধ হলেও আমার মনটা বিশুদ্ধ হবে না। সেটা খুব ভালো করেই জানি আমি।
 
দুইদিন আমি বাসা থেকে বের হলাম না। নাদিয়ার সাথে সেই অন্তরঙ্গ মুহূর্তের কথা আমি ভুলতে পারছি না। তাঁর প্রতি কেমন জানি দূর্বলও হয়ে যাচ্ছি। এমনটা হওয়ার কারণ আমি বুঝতে পারলাম না। মেয়েটাকে তো আমি ঘৃণা করি তারপরেও কেনো এমন মনে হচ্ছে? আমি কেনো তাঁর প্রতি দূর্বল হয়ে যাচ্ছি। শুনেছি কোনো মেয়ে যদি কোনো ছেলের সাথে শারীরিক সম্পর্ক করে তাহলে সেই মেয়ে ছেলেটাকে সহজে ভুলতে পারে না। সবসময় সে ছেলেটাকেই মনে করে যাকে সে নিজের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদটা বিলিয়ে দিয়েছে। কিন্তু আমি তো ছেলে। আমার ক্ষেত্রে কেনো উল্টা হচ্ছে। আমি কেনো নাদিয়ার সাথে কাঁটানো জঘন্য সময়টা ভুলতে পারছি না?
হঠাৎ করে নাদিয়ার ফোন পেয়ে ভাবনার জগত থেকে আমি নিজেকে বাস্তবে প্রতিস্থাপন করি।
 
“আমি তোমাকে মেসেজ করে একটা ঠিকানা দিচ্ছি। তুমি এখনি সেখানে চলে এসো।” কথাটা বলেই নাদিয়া ফোনটা রেখো দিলো। আমি ভয়ে হোক আর যে কারণেই হোক নাদিয়ার দেওয়া ঠিকানায় চলে যাই। সে আমাকে হাসপাতালে কেনো যেতে বলেছে বুঝতে পারলাম না।
 
হাসপাতাল গিয়ে দেখলাম নাদিয়া আদিবাকে নিয়ে বসে আছে। আমি আদিবাকে দেখেই পেছনে ফিরলাম। আমার মনে হলো এরা তো দুজন খুব ভালো বন্ধু তাহলে কি নাদিয়া সব কিছু বলেছে?
নাদিয়ার ডাকে আবার সামনে তাকালাম। আমি তাদের কাছে যেতেই নাদিয়া যে কথাটা বলল সেই কথাটা শুনে কেনো জানি ভালো লাগা কাজ করলো।
“আদিবা প্রেগন্যান্ট। ওর বয়ফ্রেন্ডকে অনেক ফোন দিয়েছি কিন্তু ফোন বন্ধ। একজন ছেলে মানুষ প্রয়োজন মনে হয়েছিল আমার কাছে তাই তোমাকে ফোন দিয়ে আসতে বলেছি।”
হায়রে! জীবন। এতোদিন প্রেম করেও ঠিকমতো একটা কিস করতে পারলাম না। অথচ স্মার্ট ছেলেটা এতো কম সময়ের মধ্যে কতো কতো কি করে ফেলেছে। এটাই বুঝি প্লে বয় আর সাধারণ বালকের মধ্যে তফাৎ। আদিবা আমার দিকে আজ তাকাতে পারছে না। তবে আমি ঠিকই তাঁর অসহায় নির্লিপ্ত চেহারাটার দিকে তাকিয়ে আছি।

জীবন যেখানে যেমন

# পর্ব-৬

আদিবাকে দেখে একটা জিনিস খুব ভালো ভাবেই বুঝতে পারলাম। সে আজ অনুতপ্ত। সে হয়তো আজ বিশ্বাস করছে আমি খারাপ মানুষ হলেও কখনো তাঁর দুর্বলতার সুযোগ নেইনি। তাকে কখনো ভালোবাসার নামে নোংরামি করতে বাধ্য করিনি। আমি তাঁর সাথে যতোদিন ছিলাম তাকে দেবি মনে করে নিজের মনের মন্দিরে পুজা করেছি। তাকে নিয়ে কখনো খারাপ কোনো চিন্তা করিনি। অথচ সে যাকে বিশ্বাস করে ভালোবেসেছিলো সেই আজ তাঁর দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাকে নষ্ট করেছে। হয়তো বাস্তবতা এমনই। যে মানুষটা আমাদের বিশ্বাসের কখনো অমর্যাদা করবে না সেই মানুষটাকেই কেনো জানি আমরা বিশ্বাস করতে পারি না। আমরা এমন মানুষগুলোকে বিশ্বাস করি যারা আমাদের বিশ্বাসের মর্যাদা কখনোই রাখে না, বিশ্বাসের সাথে খেলা করে।
আদিবা হয়তো ভেবেছে আমি তাকে দেখতে তাঁর জন্য এখানে এসেছি। কিন্তু এই ভাবনাটাও তাঁর ভুল হচ্ছে আমি তাকে বলতে পারবো না ভেবে খুব খারাপ লাগছে। আমি তো নিজের ইচ্ছেতে এখানে আসিনি। নাদিয়ার কারণে আসতে হয়েছে। ইদানীং কেনো জানি মনে হচ্ছে আমি নাদিয়ার কথা মতো নিজেকে চালাচ্ছি। অথচ আমি এই মেয়েটাকে প্রচন্ড ঘৃণা করতে চাই। ইচ্ছে করেই এই মেয়েটাকে আমি খুব খুব ঘৃণা করতে চাই। আমি তাকে এতোটা ঘৃণা করতে চাই যার বেশি কেউ কাউকে ঘৃণা করতে পারে না। কিন্তু তাঁর প্রতি আমার ঘৃণাটা যেনো দিন দিন কমে আসছে। এমনটা হওয়ার কারণ আমি বুঝতে পারছি না।

ডাক্তারের কথা শুনে যা বুঝলাম আদিবা তাঁর পেটের অনাগত সন্তানটাকে নষ্ট করতে চায়। এছাড়া কোনো উপায়ও হয়তো তাঁর নেই। দুদিনের অতিথি হয়ে যে তাঁর জীবনে এসেছিলো তাকে এখন হারিকেন দিয়েও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সেদিনের মতো সেখান থেকে চলে আসি। চলে আসার আগে আদিবা আমাকে ধন্যবাদ জানিয়েছিলো।
অনেকটা মায়া নিয়ে বলেছিলো,

” এই সময়ে যাকে আমার পাশে সবচাইতে বেশি দরকার ছিলো সে আজ আসেনি। অথচ তোমাকে এতো অপমান করার পরেও তুমি আমার জন্য এসেছো। তোমাকে ধন্যবাদ।”
কথাগুলো নাদিয়া শুনেছিলো কিনা জানি না। শুনলেও হয়তো চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতো।
দুইদিন পরের কথা,

নাদিয়াদের বাসায় গিয়ে দেখলাম তাঁর বাবা মা বাহিরে কোথাও যাচ্ছেন। ভাবলাম সোহানও হয়তো যাবে তাদের সাথে। তাই আজ আমাকে পড়াতে হবে না। কিন্তু যখন নাদিয়ার মা বলল,সোহান আর নাদিয়া বাসায় থাকবে। তারা একটু ডাক্তারের কাছে যাচ্ছে। তবে এক ঘন্টার মধ্যেই চলে আসবে। তখন কেনো জানি বুকের ভিতর এক অজানা ভয় কাজ করতে লাগলো। যদিও আমি জানি এই ভয়টা নাদিয়াকে নিয়ে।

ত্রিশ মিনিট পড়ানোর পর দেখলাম নাদিয়া দরজার সামনে নীল রং এর একটা শাড়ি পড়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই প্রথম তাকে আমি শাড়ী পড়া অবস্থায় দেখলাম। কি বিশ্রীই না দেখতে। কিন্তু না দেখতে অনেকটা মায়াবী মনে হচ্ছে। অথচ আমি জানি সে কতোটা মায়াহীন। আজকেই মনে হয় প্রথম পড়ানো অবস্থায় সে এভাবে সরাসরি রুমে ঢুকে পড়েছে। এর আগে কখনো সে এমন করেনি।
“এই সোহান তুই এখন বাইরে যা। তোর আজকে আর পড়তে হবে না। তোর স্যারের সাথে আমার কথা আছে।”
নাদিয়া কথাগুলো বলার সাথে সাথেই সোহান রুম থেকে বাহিরে চলে গেলো।
আমাকে শাড়ীতে কেমন লাগছে?
-ভালো।
-কেনো শাড়ী পড়েছি জানো?
-না। আমি যাবো। আমার কাজ আছে। কথাগুলো বলেই যখন চলে আসতে নিলাম,তখনই নাদিয়া পেছন থেকে আমার হাতটা ধরে ফেলল।
-আমার তো কথা শেষ হয়নি।
-বলো কি বলবে?
-আজকে আমার জন্মদিন। তাই শাড়ী পড়েছি শুধুমাত্র তোমাকে দেখানোর জন্য।
-দেখেছি তো। এখন যাবো আমি।
-আমাকে উপহার দিবে না?
-না,আমার কাছে টাকা নাই। আর থাকলেও দিতাম না। তুমি ভালো করেই জানো আমার কেউ নেই। আমার অার্থিক অবস্থা ভালো না সেজন্যই তোমার এতো অত্যাচার সহ্য করে তোমার ভাইকে পড়াই।
– আমি তো তোমার কাছে এমন কোনো উপহার চাই না যেটা দিতে টাকা লাগবে।
– তো কি চাও?
– আমাকে একটা কিস করো?
– তুমি এতো খারাপ কেনো?
– তোমার সাথেই খারাপ কিছু করি। আর কারো সাথে তো করি না। আর ভবিষ্যতে তো তোমাকেই বিয়ে করবো আমি।
– স্বপ্ন দেখা ভালো,তবে এতোটা দেখা ভালো না যেটা কখনোই পূ্রণ হওয়ার নয়। তোমার মতো মেয়েকে আমি বিয়ে করবো এটা ভাবলে কি করে?
– আমার মতো মেয়ের সাথে ফিজিক্যাল রিলেশন করবে এটাও তো কখনো ভাবো নি। কিন্তু করেছো তো? আমি কিন্তু এই কাজটা করার জন্য তোমাকে জোর করিনি। তুমি নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারোনি। আর তুমি নিশ্চয় এমন মানুষ না যে একটা মেয়ের এতো বড় সর্বনাশ করে অন্য একটা মেয়েকে বিয়ে করবে। আমি জানি বিয়ের তুমি আমাকে অনেক কষ্ট দিবে,ভালোবাসবে না। তবুও আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই। তোমার ভালোবাসা দরকার নেই আমার। আমি শুধু তোমাকে ভালোবাসা দিতে চাই। তোমাকে এতো বেশি ভালোবাসা দিবো যে তুমি আমাকে ভালো না বাসলেও চলবে। তোমাকে ভালোবাসার সুযোগটা আমি চাই।
– দরকার হলে কোনোদিন বিয়েই করবো না। তবুও তোমাকে নিজের বউ হিসেবে কখনো মেনে নিবো না।
– নিবে। আদিবার থেকে আমি তোমাকে হাজার গুন ভালোবাসি। সেটা তুমি খুব ভালো করেই জানো। আদিবা তোমার খারাপ সময়ে চলে গিয়েছিলো কিন্তু আমি কখনো তোমার খারাপ সময়ে তোমাকে ছেড়ে যাবো না।
– এসবের জন্য তো তুমিই দায়ি।
– আমার কারণেই তুমি তোমার কাছের মানুষগুলোকে চিন্তে পেরেছো। তোমার খারাপ সময়ে কাউকে পাশে পাওনি। এর জন্য তো আমাকে ধন্যবাদ দেওয়া উচিত। যারা খারাপ সময়ে পাশে থাকে না তাদের থেকে সবসময় দূরে থাকাই ভালো।
আমি কোনো কথা না বলেই চলে আসি। কারণ এই মেয়েটাকে আগে ডেঞ্জারাস মনে হতো। এখন কেনো জানি পাগল মনে হচ্ছে। পাগল না হলে কোনো সুস্থ্য স্বাভাবিক মানুষ এমন আচরণ করবে কেনো?
কিছুদিন পরের কথা।
আমি তখন সবেমাত্র অনার্স থার্ড ইয়ারে উঠেছি। সেদিন ছিলো মনোমুগ্ধকর ভালো লাগার মতো একটি শীতের সকাল। ক্লাস শেষে আসার সময় হঠাৎ করেই দেখলাম আদিবা সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কি বলবো বুঝতে পারলাম না। পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়াটাও খারাপ দেখায়। তাই চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম।
“তোমার সাথে কিছু কথা ছিলো। একটু ওদিকটাই চলো।”

রাস্তা থেকে কিছুটা ক্যাম্পাসের ভিতরের দিকে যেতে লাগলাম আমরা। একটা নির্জন জায়গা গিয়ে আদিবা হঠাৎ করে দাঁড়িয়ে গেলো।
“আমি জানি না তুমি নাদিয়ার সাথে এমন কিছু করেছিলে,কি করোনি। তবে এটা জানি আমি অনেক বড় ভুল করেছিলাম সেদিন,তোমার সাথে অনেক খারাপ ব্যবহার করেছিলাম। তোমার পাশে না থেকে তোমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম। অন্য কাউকে ভালোবেসে ধোঁকা খেয়েছি। জানি না তুমি কি মনে করবে। তবে আমি আবার তোমার কাছে তোমার স্বপ্নময়ী হয়ে ফিরে আসতে চাই। ভুল তো মানুষই করে। আমাকে ক্ষমা করে দিয়ে কি আবার তোমার জীবনে আপন করে নিতে পারো না?”

“না,পারি না। আমার খুব কাছের একজন মানুষ যদিও মানুষটাকে কাছের বলা ঠিক হবে কিনা জানি না। কারণ মানুষটাকে আমি খুব ঘৃণা করি। সে একদিন একটা কথা বলেছিলো। যে মানুষগুলো তোমার খারাপ সময়ে তোমার পাশে থাকেনি সে মানুষগুলো তোমার ভালো সময়েও তোমার পাশে থাকার অধিকার রাখে না। আর আমি এটাও জানি তুমি আমাকে ছাড়া ভালোভাবেই বেঁচে থাকতে পারবে। তবে মানুষ চিনতে ভুল করো না। এ নিয়ে দুইবার ধোঁকা খেলো। এর পরে কাউকে ভালোবাসলে জেনে শুনে বাসবে পরে যেনো পস্তাতে না হয়। ভালো থাকো।”
কথাগুলো বলে সোজা আমি আমার বাসায় চলে যাই। বাসা বলাটাও ঠিক হবে না। কারণ মেসে থাকি আমি। ফ্রেশ হয়ে ফোনটা হাতে নিতেই দেখলাম একুশটা মিসড কল। বলে রাখা ভালো শীতের দিনে আমি কখনো নিয়মিত গোসল করি না। নাদিয়া এতোবার কেনো ফোন দিয়েছিলো বুঝতে পারলাম না। কল ব্যাকও করলাম না। আবার মনে হলো হয়তো আদিবা তাকে কিছু বলেছে। সেজন্যই এই অসময়ে এতোবার ফোন দিয়েছে।

জীবন যেখানে যেমন

# পর্ব-৭

যেদিন ক্লাসের সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েটা সবার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলো,আমি নাকি তাঁর বুকে হাত দিয়েছিলাম,তাকে নষ্ট করতে চেয়েছিলাম। সেদিন সবাই আমার দিকে অনেক ঘৃণা নিয়ে তাকিয়ে ছিলো। ক্লাসের প্রায় আশি জন ছাত্র-ছাত্রী সবাই আমাকে খারাপ ভেবেছিলো। সবাই মেয়েটার কান্না ভেজা কণ্ঠটা বিশ্বাস করেছিলো। আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধুটাও সেদিন আমার থেকে দূরে সরে গিয়েছিলো। আমার সবচেয়ে প্রিয় শিক্ষকটা আমার গালে চড় মেরে বলেছিলো,

“তুমি অনেক ভালো ছাত্র। আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসতাম। কিন্তু তুমি আজকে যেই কাজটা করেছো তার জন্য আমার ভালোবাসাটা তোমার জন্য চিরতরে শেষ হয়ে গিয়েছে। নিজেকে একজন ভালো মানুষ হিসেবে যে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে না সে যতোই ভালো ছাত্র হোক,টাকার মালিক হোক এসবে কিছু যায় আসে না। একজন মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো সে একজন মানুষ। তবে তোমার মতো মানুষ না। তুমি এখনো মানুষ হতে পারোনি। যদি পারো মানুষ হয়ে দেখাও।”
সেদিন আমি ক্লাসের কারো দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারেনি। কোনো অপরাধ না করেও নিজেকে অনেক বড় অপরাধী মনে হয়েছিলো। আমার দুঃখটা সেদিন কারো সাথে শেয়ার করতে পারিনি। ক্লাসে যতটুকু সময় ছিলাম ততোটুকু সময় আমি নিচের দিকে তাকিয়ে শুধু চোখের পানি ফেলেছিলাম। সেদিন আমি বুঝেছিলাম চোখের পানিরও দাম কম আর বেশি হয়। কারণ মেয়েটার চোখের পানি দেখে সবাই অনেক ইমোশনাল হয়ে গিয়েছিলো,আমি মেয়েটার সাথে এসব করেছি কিনা সেটা না জেনেই সবাই মেয়েটার জলভরা চোখ দেখে তাঁর কথা বিশ্বাস করেছিলো। কিন্তু আমার চোখের পানিটা কাউকে আবেগী করতে পারেনি। আমার মতোই আমার চোখের পানিটাও কম দামী।
 
ক্লাস থেকে চলে আসার সময় ওই মেয়েটার সাথেই আমি কথা বলি। যে মেয়েটা সবার সামনে আমাকে এভাবে খারাপ একটা ছেলে হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। আমি তাঁর কাছে গিয়ে তাকে কিছু কথা বলি।
” তুমি এমনটা না করলেও পারতে। তুমি হয়তো ভেবেছিলে এমনটা করার পর আমি তোমার সম্পর্কে কোনো কিছু বললে কেউ বিশ্বাস করবে না। সবাই ভাববে তোমার ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তোমার সম্পর্কে খারাপ কথা বলছি। কিন্তু তুমি হয়তো জানো না তুমি এসব না করলেও আমি তোমার সম্পর্কে কারো কাছে কিছু বলতাম না। তবে ভয় পেয়ো না এখনও তোমার সম্পর্কে কারো কাছে কিছু বলবো না। যে মানুষটা আমাকে সবার সামনে খারাপ বানিয়েছে,আমি তাকে সবার সামনে খারাপ বানাতে চাই না।”
 
কলেজ থেকে বাসায় যাওয়ার পথে যখন দেখলাম সবাই আমার দিকে কেমন করে যেনো তাকিয়ে আছে। তখন আমার বুঝতে অসুবিধা হলো না,আমার খবরটা এলাকার অনেকেই জেনে গিয়েছে। তাই তারা আমার দিকে এভাবে তাকিয়ে আছে। এসব খবর বাতাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে যায়। আমারটাও হয়তো সেভাবেই সবার কাছে পৌছে গিয়েছে। হয়তো বা বাড়িতেও জেনে গিয়েছে। এমনিতেই মা আমার দোষ খোঁজেন সবসময়। একটু ভুল পেলেই বাড়ি থেকে বের করে দিতে চান। শুধু বাবা বলে কয়ে হয়তো আমাকে বাড়ির এককোণে ছোট্ট একটা রুম দিয়ে রেখে দিয়েছেন। মা চায় না আমি এই বাড়িতে থাকি।
যখন বাসায় গেলাম তখন দেখলাম মা আর বাবা দরজার বাহিরে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের দেখে বুঝতে পারলাম কলেজের ঘটনাটা তারা জেনে গিয়েছে। তখন আর দেরি না করে আমি বাবাকে বললাম,
“আমি কিছু করিনি বাবা,বিশ্বাস করেন। আমার মৃত মায়ের কসম বাবা আমি কিছু করিনি।”
 
“তুই যদি কিছু নাই করবি তাহলে মেয়েটা তোর সম্পর্কে এসব বলবে কেনো? তোর ক্লাসে তো আরও অনেক সুন্দর সুন্দর ছেলে আছে তাদের সম্পর্কে তো এরকম বলল না, তোর সম্পর্কে কেনো বলল? তুই এসব করেছিস বলেই সে সবার সামনে এসব বলেছে। একটা মেয়ে কখনো নিজের মানসম্মান নিয়ে এরকম মিথ্যা বলবে না। মিথ্যা তো তুই বলছিস এখন আমাদের সাথে।”
আমার সৎ মা যখন কথাগুলো বলল তখন আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলাম। কি বলবো কিছু বুঝতে পারছিলাম না। তবে এটা বুঝতে পেরেছিলাম যাই বলি না কেনো আমার কথা কেউ এখন বিশ্বাস করবে না।
 
হঠাৎ করেই মা বাবাকে যে কথাগুলো বলল সেই কথাগুলো শোনার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না।
“তুমি তোমার ছেলেকে বাড়িতে রাখলে আমি থাকবো না এই বাড়িতে। আমি কোনো ধর্ষককে এই বাড়িতে রাখতে চাই না। আমার একটা মেয়ে আছে, আমি আছি। আমরা তো ওর আপন কেউ না। আমি তো আর ওর আপন মা না,হাবিবাও তো আর ওর আপন বোন না। সুযোগ পেলে কি না কি করে বসবে কে জানে। তুমি ওকে বাড়ি থেকে বের করে দাও।”
মা যখন বাবাকে কথাগুলো বলল তখন আমার চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়ছে। আমি ভাবতাম সৎ মা হলেও একদিন আমাকে ঠিকই নিজের মায়ের মতো আদর করবে। আমি সবসময় আমার সৎ মায়ের মন জয় করার চেষ্টা করেছি কিন্তু আমি ব্যর্থ হয়েছি। তবে কোনোদিন ভাবিনি আমার সম্পর্কে এতোটা খারাপ ধারণা জন্ম নিবে তাঁর মনে। নিজেকে পৃৃথিবীর সবচাইতে অপবিত্র মানুষ মনে হচ্ছে। লজ্জায়,অপমানে সেদিন আমি তাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে পারিনি। এই বাড়ি ছাড়া কোথায় যাবো আমি সেটা না জানা সত্ত্বেও আমি সেখান থেকে কাঁদতে কাঁদতে চলে আসি। আমার বাবা একটিবারের জন্যও আমাকে থাকতে বলেনি। সেদিন আমি খুব করে বুঝেছিলাম আমাদের বাবা ছেলের সম্পর্কটা হয়তো শেষ হতে চলেছে। এটাও বুঝতে পেরেছিলাম এই বাড়িতে হয়তো আর কোনোদিন আমার জায়গা হবে না। আমাকে চলে যেতে হবে অজানা অচেনা কোনো এক নতুন ঠিকানায়।
 
আমার কাছের মানুষগুলো আমাকে বুঝতে পারেনি। ভুল বুঝে দূরে ঠেলে দিয়েছে। এখন একজন মানুষই আছে যে মানুষটা আমার শেষ ভরসা। যে মানুষটাকে আমি অনেক বিশ্বাস করি,অনেক ভালোবাসি। সে মানুষটাও আমাকে অনেক বিশ্বাস করে,ভালোবাসে। তবে কেনো জানি ভয় হচ্ছে। আর সবার মতোই কি সেও আমাকে খারাপ ভাববে,আমাকে বিশ্বাস করবে না? অনেক প্রশ্নের উত্তর থেকেই যাচ্ছে। তাঁর সাথে দেখা না হওয়া পর্যন্ত এসব প্রশ্নের উত্তর আমি পাবো না জানি। তবুও কেনো জানি প্রশ্নগুলো নিয়ে ভাবতে ইচ্ছে করছে।
 
সেদিন রাতটা আমি সিয়াম নামের এক বন্ধুর বাসায় তাঁর সাথেই থাকি। ও হয়তো বিশ্বাস করেছিলো আমি এসব করিনি। আমি এতোটা খারাপ মানুষ না যে একটা সুন্দরী মেয়ের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাঁর বুকে হাত দিবো,কিংবা কে জানে? হয়তো বা বিশ্বাসও করেছিলো। ভদ্রতার খাতিরে বলতে পারেনি। কারণ কিছু কিছু কথা থাকে যেগুলো অনেক সময় মানসম্মান কিংবা ভদ্রতার খাতিরে বলা যায় না। বিপরীত পাশের মানুষটার অবস্থার কথা চিন্তা করে অনেক মানুষই বলতে পারে না। আবার কিছু মানুষ থাকে যারা বিপরীত পাশের মানুষটা কথা চিন্তা করে না,একবারও ভাবে না কথাগুলো বললে তাঁর অবস্থাটা কি হবে।
সেদিন সিয়ামের ওখান থেকেই আমি আদিবার সাথে ফোনে কথা বলি। তাকে বিকেল তিনটার সময় আমার সাথে দেখা করতে বলি। সেও ঠিক সময়ে ঠিক জায়গায় চলে আসবে বলে ফোনটা রেখে দেয়। আমিও ঘুমানোর বৃথা চেষ্টা করে বিছানায় গা এলিয়ে দেই। তবে সেদিন রাতটা আমার নির্ঘুম কাঁটে।
 
সেদিন ছিলো শুক্রবার। সিয়ামের সাথেই জুমার নামাজটা পড়ে ওর বাসায় দুপুরে খেয়ে ওর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসি।
“আমি তোর প্রতি অনেক কৃতজ্ঞ। একটা রাত আমাকে থাকতে দিয়ে অনেক উপকার করলি।” এই কথাগুলো বলে আমি সিয়ামের ওখান থেকে আদিবার সাথে দেখা করার জন্য চলে যাই।
আদিবার সাথে দেখা করতে গিয়ে যা দেখলাম সেটা নিজের চোখকে বিশ্বাস করাতে পারলাম না। কারণ আদিবা আজ একা আসেনি,তাঁর সাথে সে একটা মেয়েকে নিয়ে এসেছে। তাঁর সাথে যে মেয়েটা এখন দাঁড়িয়ে আছে সেই মেয়েটাই ক্লাসে সবার সামনে আমাকে অপমান করেছিলো,খারাপ বানিয়েছিলো। আমি বুঝতে পারলাম না আদিবার সাথে মেয়েটার কি সম্পর্ক। আদিবার কোনো কাজিন নাকি বান্ধবী?
নতুন গল্প পেতে Email submit দিয়ে পাশে থাকুন.

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here